প্রেসনিউজ২৪ডটকমঃ রাজধানীর পাশের শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। একই সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন। সংকটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে, বাড়ছে লোকসান ও বিদেশি ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিল্পকারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। বাসাবাড়িতে লাইনের গ্যাস না থাকায় অনেকে মাটির চুলা কিংবা এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে তাদের।তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জে তাদের আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি।
কয়েকশ’ শিল্প গ্রাহকও রয়েছে এ শিল্পাঞ্চলে। সদর উপজেলার সস্তাপুরের বাসিন্দা আকলিমা রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। লাইনের গ্যাস না থাকায় তিনি ফ্ল্যাটের ভেতর মাটির চুলা ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন লাইনে কোনো গ্যাস না থাকলেও বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে দুই বেলা বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে মাটির চুলা এনেছি। কিন্তু লাকড়ির চুলার ধোঁয়া হয় অনেক।
বাড়িওয়ালাও আপত্তি করছেন। আমরা মহা সংকটের মধ্যে আছি।গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাটেও ভোগান্তি বেড়েছে। কাশীপুরের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় এক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন আমার বাসায় বয়স্ক মা আছেন। দুই সন্তান সামনে পরীক্ষা দিচ্ছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহ ধরে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। গরমে খুব কষ্ট হচ্ছে।
শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত: গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জের শিল্পখাতে। বাংলাদেশ নিট ডায়িং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাস সংকট ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ডায়িং শিল্পের কারখানাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, কোথাও গ্যাসের চাপ কম, কোথাও অনিয়মিত এবং কোথাও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে উৎপাদন বন্ধ রাখছে। আমজাদ হোসেন বলেন, “ডায়িং, ফিনিশিং ও বয়লারসহ বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়া গ্যাসের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। পাশাপাশি ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদনপ্রক্রিয়া বারবার বন্ধ ও চালু করতে হচ্ছে।
এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তার ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে অর্ডার বাতিল এবং বিদেশি ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংকট নিরসন, গ্যাসের চাপ বাড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সংকটের কারণে বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন নিট ডায়িং ও টেক্সটাইল মিলস শিল্পের মালিকরা।
এর মধ্যে গত ২২ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০০ পোশাক কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে।
তিনি বলেন গত এক মাসে অন্তত ৪০ শতাংশ রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সময়মতো পণ্য পাবেন না—এমন আশঙ্কায় বিদেশি ক্রেতারাও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান না হলে উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাই, অর্ডার বাতিল এবং রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল।





