প্রেসনিউজ২৪ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগ গত প্রায় ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। বিভাগের একমাত্র মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মৃত্যুর পর নতুন কাউকে পদায়ন না করায় গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রতিদিন শতাধিক রোগী বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বাইরে বেশি খরচে এক্স-রে করাচ্ছেন। এতে সীমিত আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে, পাশাপাশি ভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় সাঁটানো একটি নোটিশে লেখা রয়েছে ‘এক্স-রে পরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। দাঁতের তীব্র ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে করাতে হাসপাতালে এসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব শিক্ষক জেসমিন সাহানা। কিন্তু বিভাগ বন্ধ থাকায় তাকে বাইরে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে ৫০০ টাকা খরচ করে এক্স-রে করাতে হয়েছে। অথচ হাসপাতালেই এই পরীক্ষা করা গেলে তার খরচ হতো মাত্র ২০০ টাকা।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন,এক্স-রে করাতে এসে দেখলাম বিভাগ বন্ধ। ডাক্তার বাইরে থেকে করিয়ে আনতে বললেন। পরে ৫০০ টাকা দিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এই অতিরিক্ত টাকা দেওয়া অনেক কষ্টের। সরকারি হাসপাতাল তো সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্যই। শুধু জেসমিন সাহানা নন, গত প্রায় ছয় মাস ধরে একই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রতিদিন শতাধিক রোগী। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এক্স-রে বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আলী আকবর খানের মৃত্যুর পর থেকেই বিভাগটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে নতুন কাউকে পদায়ন না করায় সেবা আর চালু করা সম্ভব হয়নি।
থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসা নিতে আসা শম্পা আক্তার বলেন, চিকিৎসক তাকে এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিলেও সব পরীক্ষাই বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। তিনি বলেন,শরীরে অনেক ধরনের সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে পায়ের ব্যথাও আছে। হাসপাতালে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকলে অনেক সুবিধা হতো। একই ধরনের অভিযোগ করেন আরও কয়েকজন রোগী। তাদের দাবি, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষাও অনেক সময় হাসপাতালের পরিবর্তে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করাতে বলা হয়।
জ্বরে আক্রান্ত আট বছরের সালমানকে নিয়ে হাসপাতালে আসা তার নানা রফিকুল ইসলাম বলেন, “ডাক্তার ডেঙ্গুসহ কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন। কোথায় হয় জানি না, শুধু বাইরে থেকে করাতে বলেছেন। তাই বাইরে থেকেই করাতে হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। এছাড়া প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। সেই হিসেবে মাসে প্রায় ৬০ হাজার রোগী বহির্বিভাগে এবং প্রায় ৩ হাজার ৬০০ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন।
এত বিপুল সংখ্যক রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক্স-রে বিভাগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাকে স্বাস্থ্যসেবার বড় সংকট হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরের ১৪ জুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হাসপাতালটি পরিদর্শন করে আইসিইউ সেবার উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সেবার মান উন্নয়ন, জনবল সংকট নিরসন, পরিবেশ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশনা দেন। তবে দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এসব বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এক্স-রে বিভাগের জন্য নতুন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদায়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও জেলার সিভিল সার্জনের মাধ্যমে আবারও বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, সাময়িকভাবে জেলার উপজেলা হাসপাতালগুলো থেকে সপ্তাহে দুই দিন করে একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এনে সেবা চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
তবে দেশের প্রায় সব হাসপাতালেই জনবল সংকট থাকায় সেটি বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও জেলার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মুহম্মদ মুশিউর রহমান বলেন, “মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মৃত্যুর কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি। পরিচালক (প্রশাসন)-এর সঙ্গেও কথা হয়েছে। সর্বশেষ ২ জুলাই আবারও চিঠি পাঠানো হয়েছে। তারা খুব দ্রুত একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদায়নের আশ্বাস দিয়েছে। নি
রাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি জানান, উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলেও নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জন্য ৩০ জন আনসার সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব অর্থ বিভাগে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন মিললেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এই হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগ দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বন্ধ থাকায় প্রতিদিনই বাড়তি অর্থ ব্যয় করে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাদের প্রত্যাশা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে এক্স-রে বিভাগ চালু করবে এবং সরকারি হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।





