প্রেসনিউজ২৪ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় ইসলামী ছাত্র শিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুর বারোটার দিকে সরকারি তোলারাম কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে এক সভায় বক্তব্য দেওয়াতে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মো. হাসিনুজ্জামান।
দেড় ঘন্টা পর পুলিশ উভয়পক্ষকে চাষাঢ়ার কলেজ রোডে মুখোমুখি অবস্থান থেকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাসিনুজ্জামান বলেন, তোলারাম কলেজে আলোচনা সভায় বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ছাত্র শিবির ও ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে, তাদের জখম মারাত্মক নয়।
খবর পেয়ে ফতুল্লা থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের বিপুল সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং উভয়পক্ষকে সেখান থেকে সরিয়ে দেন বলে জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা। প্রত্যক্ষদর্শী সরকারি তোলারাম কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে কলেজের অডিটোরিয়ামে সভা চলছিল। সেখানে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারাও বক্তব্য রাখেন।
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একে অপরকে উদ্দেশ্য করে উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখেন। এ পাল্টাপাল্টি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পরে আল্লামা ইকবাল রোড (কলেজ রোড) ও চাষাঢ়ায় সংঘর্ষে জড়ান। উভয়পক্ষের লোকজনের হাতে লাঠিসোঁটা, লোহার পাইপ ও বাঁশ দেখা যায়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সভাপতি অমিত হাসান বলেন, “তোলারাম কলেজের ভেতরে আমাদের নেতাদের মারধর করেছে।
গত কয়েকদিনের রাজনৈতিক উত্তাপকে ঘিরে এ ঘটনা ছাত্রদল ঘটিয়েছে। আমরা সেখানে গেলে লাঠিসোঁটা দিয়ে আমাদের কয়েকজনকেও আঘাত করেছে। আমিও মাথায় আঘাত পেয়েছি। তোলারাম কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এমদাদুল হক শুভ, সাধারণ সম্পাদক তামিম ইকবাল ও অর্থ সম্পাদক জুহাজ আহত হয়ে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলেও জানান অমিত। তাদের সংগঠনের আরো অন্তত ৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, ছাত্রদলের কর্মী তোলারাম কলেজের স্নাতক বাংলা বিভাগের ছাত্র তুহিন আহমেদ ও রবিন নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানান ছাত্রদল তোলারাম কলেজ শাখার সভাপতি মনির হোসেন জিয়া। তিনি বলেন,তোলারাম কলেজে সভা চলছিল। সেখানে ওরা উচ্ছৃঙ্খল বক্তব্য দিয়ে গিয়েছে। আমরা বলেছি, এ ক্যাম্পাস সহাবস্থানে ছিল সহাবস্থানে আছে, কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা চলবে না। এজন্য আমাদের ছাত্রদলের ছেলে তুহিন ও রবিনসহ কয়েকজনকে ওরা মেরেছে।
সংঘর্ষে এক সংবাদকর্মীও আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি জানিয়ে জেলা পুলিশের ডিবি প্রধান হাসিনুজ্জামান। তিনি বলেন, “তদন্ত করে, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পর এ এলাকায় যারা সন্ত্রাস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, যারা এ কাজ করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবো।
এদিকে, দেড়টার পর পুলিশ ছাত্র শিবিরের নেতাদের সরিয়ে দিলে তারা সেখান থেকে চলে গেলেও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা কলেজ রোড, জামতলা, চাষাঢ়া ও কালিরবাজার এলাকায় লাঠিসোঁটা হাতে মিছিল করেন। তাদের সঙ্গে যুবদলের নেতাকর্মীদেরও দেখা যায়। বেলা আড়াইটাও তাদের বিভিন্ন সড়কে শিবিরের বিরুদ্ধে মহড়া দিতে দেখা যায়।
পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদসহ বিএনপির নেতা-কর্মীরা কলেজে যান।
তারা অধ্যক্ষ ও কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বিএনপি নেতারা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের সহিংস কার্যক্রম তারা প্রত্যাশা করেননি। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদেরও এই ধরনের ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তারা। এদিকে নাসিক প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এড. সাখাওয়াত হোসেন খান এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ আহত ছাত্রদল নেতাদের দেখতে হাসপাতালে যান।
এদিকে, সাংবাদিকদের দেওয়া এক বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর মহানগর শাখার আমীর মাওলানা আবদুল জব্বার বলেন, “ফ্যাসিবাদকে দূর করতে আমরা একত্রে লড়াই সংগ্রাম করেছি। আমাদের মধ্যে এই ধরনের সংঘাত কাম্য নয়। আমরা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ চাই। সংঘর্ষের ঘটনার পর বিকেলে ইসদাইর এলাকায় অবস্থিত তোলারাম কলেজের ‘শের-ই বাংলা ছাত্রাবাস’ বন্ধের ঘোষণা দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম ও হোস্টেল সুপারের স্বাক্ষরিত এক নোটিশে বিকেল চারটার মধ্যে এই ছাত্রাবাসের আবাসিক ছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ছাত্রাবাস বন্ধ থাকবে বলেও জানানো হয়।
এদিকে, কলেজের পাশে ‘ছাত্রী নিবাসের’ ছাত্রীদেরও হল গেইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। হলের এক শিক্ষার্থী মুঠোফোনে জানান, নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রীরা পড়াশোনা ও টিউশনির জন্য রাত আটটা পর্যন্ত বাইরে থাকতে পারেন। কিন্তু সংঘর্ষের ঘটনার পর হল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং পরিস্থিতি শিথিল না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বের না হওয়ার জন্য হল সুপার দারোয়ানকে নির্দেশনা দিয়েছেন।





