সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ গণপূর্তের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিরব!

0
সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ গণপূর্তের  প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিরব!

প্রেসনিউজ২৪ডটকমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ঠিকাদারের ১০ লাখ টাকার জামানতের পে-অর্ডার অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও বিভাগীয় শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া, পরবর্তীতে পদোন্নতি লাভ, এরপর সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পেয়ে বদলি বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাঁকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের জবাবদিহি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে।

গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে কাশিমপুর কারাগার-২–এর জন্য এইচটি ক্যাবল ফল্ট লোকেটর মেশিন সরবরাহ প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকার একটি ব্যাংক পে-অর্ডার জামানত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। সরকারি বিধি অনুযায়ী কাজ সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর ওই জামানত ঠিকাদারকে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, ঠিকাদারের অজান্তে ও নিয়মবহির্ভূতভাবে ওই পে-অর্ডার নগদায়ন করা হয়েছে। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. আবুল হাশেম গণপূর্ত অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, জামানত বাবদ জমা দেওয়া ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার অবৈধভাবে ক্যাশ করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণ হিসেবে উল্লেখ করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হয়। পরে তিনি লিখিত জবাব দেন এবং ব্যক্তিগত শুনানিতেও অংশ নেন।

মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, এটি তাঁর চাকরি জীবনের প্রথম অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং ভবিষ্যতে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন। এসব বিবেচনায় তাঁকে সতর্ক করে বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রশাসনিক শাস্তি না হওয়ায় তখনই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতির পর সারোয়ার জাহান পদোন্নতি পেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান।

এই পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে বদলি বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বদলি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। বলা হয়, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হতো এবং যেসব কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা দিতে রাজি হতেন না, তাঁদের ঘনঘন বদলির মাধ্যমে চাপের মধ্যে রাখা হতো।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে। অভিযোগ রয়েছে, একদিনেই অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীর বদলির আদেশ জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে ন্যূনতম দুই বছর দায়িত্ব পালন না করলে সাধারণত বদলি করা হয় না। কিন্তু এই ক্ষেত্রে অনেক কর্মকর্তাকে নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই বদলি করা হয়। এতে প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন দেখা দেয়, কী কারণে এত বিপুলসংখ্যক বদলি একদিনে করা হলো এবং এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন ছিল কি না।

পরবর্তীতে বিষয়টি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নজরে এলে বিতর্কিত বদলি আদেশগুলোর একটি অংশ স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতে পূর্বানুমোদন ছাড়া বদলি ও পদোন্নতির ফাইল অগ্রসর না করার নির্দেশ দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে শুধু বদলি নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৪ থেকে ২০ গ্রেডের ৬৬৯টি পদের নিয়োগ কার্যক্রম শেষে খালি থাকা ১২৮টি পদে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গত ২১ মে একটি তালিকা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলেও কিছু সময়ের মধ্যেই সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। অপেক্ষমাণ প্রার্থীদের অভিযোগ, মেধাতালিকার প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তদবিরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। তারা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে দাবি করা হয়, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে বিশেষ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে তালিকা পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে।
ওয়েবসাইট থেকে তালিকা সরিয়ে ফেলার বিষয়ে সারোয়ার জাহান বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল।

সে কারণেই প্রকাশিত তালিকা প্রত্যাহার করা হয়। তবে অভিযোগকারী প্রার্থীরা তাঁর এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। এদিকে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। ভিডিওতে সারোয়ার জাহানের টেবিলে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি দাবি করেন, এটি নিয়োগ কার্যক্রমের বিভিন্ন দাপ্তরিক খরচের অর্থ। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী এক বক্তব্যে বলেন, এটি জুন মাসের হিসাব-নিকাশের টাকা ছিল।

তবে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওই অর্থের উৎস এবং ব্যবহার নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর সারোয়ার জাহান প্রশাসনের ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করেন। বদলি, পদায়ন, নিয়োগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁর একক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বদলি করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রাধান্য পেয়েছে।

অন্যদিকে অতীতের পে-অর্ডার কেলেঙ্কারি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়, যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও তিনি শাস্তি পাননি। বরং পরবর্তীতে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। বিষয়টি প্রশাসনিক জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি সরকারি তদন্ত কমিটি যখন অনিয়মের সত্যতা খুঁজে পায় এবং বিভাগীয় মামলাও দায়ের হয়।

তখন অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে শুধু ক্ষমা চাওয়ার ভিত্তিতে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক প্রশাসনিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অন্য কর্মকর্তাদের জন্যও ভুল বার্তা বহন করতে পারে। বর্তমানে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে জমা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগে বদলি বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অতীতের পে-অর্ডার কেলেঙ্কারির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, তাঁর সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব পালনকালে একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং অযৌক্তিক বদলির মাধ্যমে কর্মকর্তাদের হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যদিও সারোয়ার জাহান তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অধিকাংশ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে বলতে উদ্ধৃত করা হয়েছে, “এজন্য আমি ক্ষমা চাইছি।

অন্যদিকে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, সব বদলি অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়েছিল এবং পরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংস্থাপন শাখা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট। এই শাখার মাধ্যমে বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি ও জনবল ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে এই শাখায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পুরো অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা—তা নির্ধারণের একমাত্র উপায় হলো স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকেও যথাযথভাবে দায়মুক্ত ঘোষণা করা প্রয়োজন। বর্তমানে সারোয়ার জাহানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো প্রশাসনিক এবং অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত, মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের বিষয়টি বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হলেও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় বা ফৌজদারি দণ্ডের তথ্য প্রকাশ হয়নি।

ফলে বিষয়গুলো তদন্তাধীন অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া, বিভাগীয় মামলা হওয়া, পরে শাস্তি ছাড়াই অব্যাহতি লাভ, এরপর পদোন্নতি এবং পুনরায় একের পর এক নতুন অভিযোগ সামনে আসা গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here