প্রেসনিউজ২৪ডটকমঃ আবদুল মান্নান: শীতের এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে থমকে গেল বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বিশাল স্পন্দন। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক সকাল ৬টা। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে নিয়তির ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রাণভোমরা বেগম খালেদা জিয়া। আজ কেবল একজন ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু হয়নি, আজ মৃত্যু হয়েছে একটি জীবন্ত ইতিহাসের।
একটি মহাকাব্যের শেষ পাতাটি আজ পঠিত হলো, যার প্রতিটি লাইনে লেখা ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ আর চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা নত না করার অমর গল্প। পৃথিবীর মায়া, দেশের মায়া আর কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করে তিনি আজ পাড়ি জমিয়েছেন সেই চিরন্তন ঠিকানায়, যেখানে সকলকেই একদিন যেতে হবে। বেগম খালেদা জিয়া, এই নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অটল হিমালয়ের ছবি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীন শব্দটি যেন কেবল তার জন্যই সৃষ্টি হয়েছিল।
১৯৮১ সালে স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদাতের পর যখন দলটি চরম অস্তিত্ব সংকটে, তখন এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে তার পদার্পণ ছিল এক বিস্ময়কর অধ্যায়। তিনি চাইলে সেদিন ক্ষমতার মোহ বা আরাম আয়েশের জীবন বেছে নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাজপথকে। দীর্ঘ নয় বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।
টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ কিংবা গৃহবন্দিত্ব, কোনো কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। বারবার চক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু তিনি নীতির প্রশ্নে ছিলেন অটুট। তাঁর সেই সাহসিকতাই তাঁকে কোটি মানুষের দেশনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯৯১ সালে জনগণের বিপুল জনরায়ে তিনি যখন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকেই শুরু হয় এক নতুন বাংলাদেশের পথচলা। তাঁর হাতেই বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হয়েছিল।
মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে তিনি যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তার সুফল আজ দেশজুড়ে দৃশ্যমান। দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষার এই মডেল আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। যমুনা সেতু থেকে শুরু করে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, প্রতিটি ইটে মিশে আছে তাঁর স্বপ্ন আর মেহনত। তিনি কেবল দল চালাননি, তিনি একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে ত্যাগের মহিমা ছিল সীমাহীন। বিশেষ করে ২০০৭ সালের এক এগারোর সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে যখন তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, বিদেশে আমার কেউ নেই, এ দেশেই আমার জন্ম, এ দেশেই আমি মরব। সন্তানদের বন্দিত্ব, শারীরিক অসুস্থতা এবং নিজের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের মুখেও তিনি বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ের হাতছানি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই একনিষ্ঠ দেশপ্রেমই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে থাকতে চেয়েছেন। এমনকি কারান্তরালে থেকেও তিনি যে ধৈর্য আর সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা আগামীর প্রজন্মের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। বিগত কয়েক বছর ধরে তাঁর জীবন ছিল শারীরিক যন্ত্রণায় নীল। লিভার সিরোসিসসহ নানা মরণব্যাধি তাঁর শরীরকে জীর্ণ করলেও তাঁর মনের তেজ ছিল অম্লান। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে যখন তিনি লড়ছিলেন মৃত্যুর সাথে, তখন সারা দেশের মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় প্রার্থনা করেছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।
আজ ভোর ৬টায় যখন চিকিৎসক দল তাঁর চিরবিদায়ের ঘোষণা দিলেন, তখন পুরো দেশ যেন এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকান, সবখানে আজ কেবল একটিই আলোচনা, আমাদের মা আর নেই। এই শোক কেবল বিএনপির নয়, এই শোক প্রতিটি সেই মানুষের, যারা গণতন্ত্রের জন্য স্বপ্ন দেখে।মানুষ মরণশীল, কিন্তু মহাকালের পাতায় কিছু নাম খোদাই করা থাকে যা কখনো মোছা যায় না। বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা উড্ডীন রাখতে তাঁর ভূমিকা ছিল অতন্দ্র প্রহরীর মতো। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে প্রতিকূল স্রোতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তিনি কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, কোনো অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। নীতির প্রশ্নে এই অটুট থাকা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে অমর করে রাখবে। হাজার বছর পরও যখন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস লেখা হবে, সেখানে একটি নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করবে, বেগম খালেদা জিয়া।
পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আপনাকে চলে যেতে হলো সেই অন্তিম ঠিকানায়। এই বিদায়ে সারা দেশের আকাশ বাতাস আজ ভারী হয়ে উঠেছে মানুষের কান্নায়। আপনার শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। তবে আপনি যে আদর্শের বীজ বপন করে গেছেন, যে সাহসিকতার পথ দেখিয়ে গেছেন, তা কোটি কোটি জাতীয়তাবাদী কর্মীর হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল। আপনার স্মৃতি হোক চিরস্থায়ী, আপনার আত্মা লাভ করুক পরম শান্তি।
আপনি ছিলেন, আপনি আছেন এবং আপনি থাকবেন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে, এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী, অকুতোভয় এবং আপসহীন নেত্রী হিসেবে। বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ একটি যুগের অবসান ঘটাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে যে ধ্রুবতারাটি দিকনির্দেশনা দিত, তা আজ অস্তমিত। কিন্তু তাঁর জীবনদর্শন এবং সংগ্রামের ইতিহাস আগামীর গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে ধ্রুবতারার মতোই আলো দেবে। হে দেশনেত্রী, আপনি শান্তিতে ঘুমান। বাংলাদেশ আপনাকে কোনোদিন ভুলবে না।





