প্রেসনিউজ২৪ডটকমঃ শহর প্রতিনিধি: বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি)‘র নারায়ণগঞ্জ
জেলা ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্নীতি, ঘুষ, অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য, ভুয়া সনদ প্রদান এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন একাধিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভিডিপি সদস্য।
অভিযোগকারীরা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে নাম-পরিচয় গোপন রেখেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের ঐতিহ্যবাহী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সুনাম বর্তমানে একটি সংঘবদ্ধ অসাধু চক্রের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দলনেতাদলনেত্রী দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ, বদলি, ডিউটি প্রদান, ভাতা ও রেশন বিক্রিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অবৈধ আর্থিক লেনদেন চালিয়ে আসছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, জেলা কার্যালয়ে অফিস সহকারী পদে কর্মরত পংকজ বারিকদার বাস্তবে জেলা পর্যায়ের নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন। অফিস সহকারী পদে থাকার পরও তিনি অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের অবৈধ বদলি, ভুয়া কমান্ড সার্টিফিকেট তৈরি এবং আর্থিক লেনদেনে সরাসরি জড়িত। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ভিডিপি সদস্যদের পহরী হিসেবে নিয়োগে প্রতি বছর লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বহিরাগতদের কাছে রেশন বিক্রি করছে বলে জেলা কমান্ড্যান্টের অফিসে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে প্রমাণ মিলবে বলে দাবিও করা হয়েছে। নিরাপত্তা প্রহরী পদে কর্মরত মোঃ বজলু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে জেলা কমান্ড্যান্ট কার্যালয়ে অফিস সহকারীর দায়িত্ব পালন করে বদলি তালিকা, ভাতা ও রেশন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, যা তার নির্ধারিত কর্মদায়িত্বের বাইরে এবং বিধিবহির্ভূত। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার এনায়েত নগর ইউনিয়নের দলনেতা হযরত আলী খানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে সবচেয়ে গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগে বলা হয়, প্রয়োজনীয় কমান্ডার প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ইউনিয়ন কমান্ডার বা দলনেতা পদ দখল করেন। তার নিজ এলাকায় আনসার বাহিনী ক্লাব নামে একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে ভিডিপি সদস্যদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা আদায়, নিয়োগ বাণিজ্য ও ভুয়া আইডি কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। নির্বাচন, পূজা ও অন্যান্য বিশেষ দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার সময় সদস্য প্রতি ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। 
এছাড়া সরকারি দপ্তরে তিনজন ভিডিপি সদস্যকে নিয়োগ দিয়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আদায়ের তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত আলীর বিরুদ্ধে পূর্বেও বেতন আত্মস্বাদ করার নংড়া ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলো কিন্তু জেলা কমান্ড্যান্ট এই বিষয়ে কোনো প্রদক্ষেপ নেননি। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কোম্পানি কমান্ডার আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে তার দায়িত্ব স্থগিত হলেও পরে বর্তমান জেলা কমান্ড্যান্টের ঘনিষ্ঠতার কারণে পুনরায় তাকে দায়িত্বে বহাল করা হয়। তার বিরুদ্ধে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলেও কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ফতুল্লাহ ইউনিয়নের দলনেতা সেলিম খন্দকারের বিরুদ্ধেও অর্থের বিনিময়ে অপ্রশিক্ষিত ও মামলাভুক্ত ব্যক্তিদের ভিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি শাহিন মোল্লাহ তিন মাস কারাভোগের পর পুনরায় ভিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ পান, যা আইন ও বাহিনীর বিধির পরিপন্থী। অন্যদিকে দলনেতা মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, সদস্যদের প্রকাশ্যে হুমকি প্রদান এবং অর্থের বিনিময়ে আনসার বাহিনীর প্রকাশনায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতির পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ সদস্যদের মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, দুর্গাপূজা উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলার ২২৩টি মণ্ডপে দায়িত্ব পালনকারী প্রায় ১ হাজার ৭৮৪ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্যের বেতন থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভ্যাটের নামে অর্থ কর্তন করা হয়েছে। কোনো ধরনের নোটিশ বা সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সদস্য প্রতি ১০ টাকা করে কেটে নেওয়া হয়, যার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। এতে হাজার হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
ভিডিপি সদস্যরা দাবি করেন, এসব অনিয়মের বিষয়ে জেলা কমান্ড্যান্টকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং অভিযোগকারীরা হুমকি ও চাপের মুখে পড়েছেন। ফলে বাহিনীর ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে এবং যোগ্য ও সৎ সদস্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগের সঙ্গে পত্রিকার কাটিং, ভিডিও ফুটেজ ও অডিও প্রমাণ সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীরা দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধভাবে আদায়কৃত অর্থ ফেরত এবং অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তা ঘিরে এখন নারায়ণগঞ্জসহ সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।





