প্রেসনিউজ২৪ডটকমঃ মুঃ আঃ মোতালিবঃ তালতলী, বরগুনাঃ এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সংগে একাধিক চাকরি বা লাভজনক পদে কেন থাকতে পারবেন না এবং শিক্ষামন্ত্রণালয়ের জারি করা এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ ১৭ (ক ও খ) এর বিধান কেন বাতিল ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর মাউশির মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি পর বিচারপতি ইউসুফ আব্দুল্লাহ সুমন ও বিচারপতি দিহিদার মাসুদ কবির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি ২০২৫) সরকারের সংশ্লিষ্ঠদের প্রতি এ রুল জারি করেন।
গত ৭ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে জারি করা ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। এর আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক চাকরি বা লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। এর মধ্যে সাংবাদিকতা বা আইন পেশাও আছে। নতুন নীতিমালার ১১.১৭ (ক) ও (খ) বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক মুহাম্মদ মাসুদ হাসানসহ ১০ জন ওই রিট করেন।
আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শহিদউল্লাহ ও মিজান-উর রশিদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আরিফুল আলম। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মহসিন কবির বলেন, হাইকোর্ট নীতিমালার ওই বিধান নিয়ে শুধু রুল দিয়েছেন। রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শহিদউল্লাহ বলেন, নীতিমালার ১১.১৭ (ক) ও (খ) বিধি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।
নতুন নীতিমালার ১১.১৭ (ক) অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক কোনো পদে বা চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক কোনো পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। এটি তদন্তে প্রমাণিত হলে সরকার তাঁর এমপিও বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আর ১৭ (খ) ভাষ্য, আর্থিক লাভজনক পদ বলতে সরকারের দেওয়া যেকোনো ধরনের বেতন বা ভাতা বা সম্মানী এবং বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বা সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় কর্মের বিনিময়ে বেতন বা ভাতা বা সম্মানীকে বোঝাবে।
এই বিধান সন্নিবেশিত করায় বিপাকে পড়েন বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক। এরপর দেশজুড়ে শিক্ষকসমাজের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার পাশাপাশি মফস্বল এলাকায় খন্ডকালীন সাংবাদিকতা করেন, এমন সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক-সাংবাদিকের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। অনেক জেলা ও উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। অনেকে উপজেলা/জেলা পর্যায়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা, অনলাইন বা টিভি চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে থাকেন।
তাদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ করে সমাজসেবামূলক বা সম্মানীর বিনিময়ে কোনো কাজে যুক্ত থাকা অন্যায় নয়। এদিকে বেসরকারি শিক্ষক সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের নেতারা দাবী করেছেন, দেশের এমপিওভুক্ত বহু বেসরকারি শিক্ষক রাজনীতি করছেন, জনপ্রতিনিধি হয়ে বেতন-ভাতা ও সম্মানী নিচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকগণ সরকারি দায়িত্ব পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চেম্বারে নিয়োজিত থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
সরকারি কর্মকর্তারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে বিভিন্ন ধরনের সম্মানি গ্রহণ করছেন। এতে কোন সমস্যা নেই। তাহলে বেসরকারি শিক্ষকরা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন পরবর্তী অবসর সময়ে সাংবাদিকতা করলে সমস্যা কোথায়? তাছাড়া সাংবাদিকতা একটা মেধা ও বুদ্ধি ভিত্তিক সৃজনশীল কাজ। মহৎ এই কাজের মাধ্যমে দেশ ও সমাজের অনেক উপকার করার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের সাংবাদিকতায় নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সংবিধানের আর্টিকেল ২৬ ও ২৭ ধারা লংঘন করা হয়েছে।
তাছাড়া সাংবাদিকতায় বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের কাজের বা দায়িত্বের কোন নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত নেই। তারা তাদের সুবিধামতো সময়ে এ কাজটি করে থাকেন। বিনিময়ে অধিকাংশ গণমাধ্যম হতে কোন নির্দিষ্ট বেতন ভাতাও দেওয়া হয় না। কিছু কিছু গণমাধ্যম যতসামান্য সম্মানি দিয়ে থাকে। তারপরও তারা সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা হতে বহু বছর ধরে লেখালেখির এ কাজটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সাংবাদিকতা শিক্ষকতার মতোই একটি মহতি কাজ। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে শিক্ষকদের সাংবাদিকতা তথা কন্ঠরোধ করা হচ্ছে।
এতে দেশে মফস্বল সাংবাদিকতায় ধ্বস নামবে। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত, সুযোগ-সন্ধানী, টাউট-বাটপার ও চাঁদাবাজ কথিত সাংবাদিকদের দৌরাত্ম বৃদ্ধি পাবে। যা দেশ ও সমাজের জন্য অনেক ক্ষতির কারন হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক মাসুদ হাসান বাদল বলেন, আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার বহাল রাখতে আদালতের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছি। আমরা শিক্ষকতায় কোন ধরনের গাফিলতি বা পেশার ক্ষতি না করেই সাংবাদিকতার মতো সমাজ সেবামূলক মহতি কাজের সাথে বহুবছর ধরে যুক্ত আছি।
এ থেকে আমরা কোন বেতন-ভাতও পাই না। অল্প কিছু গণমাধ্যম সম্মানী ভাতা দিয়ে থাকে। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি পৃথিবীর অনেক দেশে শিক্ষকরা শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করে থাকেন। তাদের মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতাকে তাদের সরকার দেশের কাজে ব্যবহারের সুযোগ করে দেন। তাছাড়া আমাদের দেশে সাংবাদিকতার কোন নীতিমালা নেই। যে কারনে দেশে বিশেষ করে মফস্বলে ভয়াবহ আকারে অপ-সাংবাদিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, সুযোগ সন্ধানী, অযোগ্যরা এ পেশায় ঢুকে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভালোমানের শিক্ষিত লোকজন মফস্বল সাংবাদিকতায় তেমন একটা আসতেই চান না। তারপরও মফস্বলে এখনো শিক্ষিত ও ভালোমানের সাংবাদিক রয়েছেন। তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম। এমতাবস্থায় শিক্ষক তথা শিক্ষিত লোকদের হাত থেকে কলম কেড়ে নেওয়া দেশ ও জাতির জন্য একটা ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। আমরা এ সিদ্ধান্ত বাতিলে মহামান্য আদালত ও সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
বর্তমানে সারা দেশে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে আছেন ৩ লাখ ৯৮ হাজার, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় পৌনে ২ লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে আছেন ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী।





